রোজার বিধান ও রোজার ফজিলত সম্পর্কে জানুন

সুপ্রিয় পাঠক, আসসালামুয়ালাইকুম। আজকে আমরা রোজার বিধান ও রোজার ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা করব। একজন মুসলমান হিসাবে রোজার বিধান ও রোজার ফজিলত সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য খুবই জরুরী। আমরা যখন রোজার বিধান ও রোজার ফজিলত সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাবো তখন বিষয়গুলো আমাদের জন্য মানাও অনেক সহজ হয়ে যাবে।
রোজার বিধান ও রোজার ফজিলত
আলহামদুলিল্লাহ দীর্ঘ একটি বছর অপেক্ষা করার পর আমরা আমাদের জীবনে আরেকটি রমজান মাস পেতে যাচ্ছি। মুসলমানদের জন্য রমজান মাস হলো ফজিলত ও সওয়াব অর্জনের মাস। তাই যখনই রমজান মাস আমাদের সামনে আসে তখন আমাদের মনে সচরাচর কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়। আর তাই রোজার বিধান ও রোজার ফজিলত সম্পর্কে জানুন এই আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়লে আশা করি সেই প্রশ্নের উত্তর গুলো পেয়ে যাবেন।

রোজা কাকে বলে?

আলোচনা শুরুতেই আমাদের জানতে হবে রোজা কাকে বলে? আমরা অনেকেই রোজা থাকি কিন্তু রোজা রোজা একটা সংজ্ঞা আছে এটা আমরা জানিনা তাই আসুন আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়ে জেনে নেই রোজা কাকে বলে?
সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়ত সহ সকল প্রকার পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকাকে রোজা বলে।

রোজার বিধান

রোজার বিধান বিষয়টা জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্যই কর্তব্য। আমরা মুসলমানরা শুধুমাত্র নামে মুসলমান না হয়ে কোরআন এবং হাদিস জেনে এবং তা পালন করে আমাদের আমলকে আরো সমৃদ্ধশালী করতে পারি। তাই রোজার বিধান জানাটা আমাদের জন্য জরুরী। আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়ে রোজার বিধান সম্পর্কে জেনে নিন।
প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক,সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন ব্যক্তির উপর রমজানের রোজা রাখা ফরজ। কুরআনে কারীমের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
يا ايها الذين امنوا كتب عليكم الصيام كما كتب على الذين من قبلكم لعلكم تتقون
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা কে ফরজ করা হয়েছে যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল। (সূরা বাকারা)

রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যারা রোজা করি অথবা যারা বিভিন্ন কারণে করতে পারি না আমাদের প্রত্যেকের জন্যই রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য জানাটা জরুরী। কারণ রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিজে জানা এবং অন্যকে জানানোও আমাদের কর্তব্য। তাই আসুন, মনোযোগ সহকারে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য জেনে নেই।
  • রমজান মাস এমন একটি মাস যেই মাসেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অধিকাংশ আসমানী গ্রন্থ গুলোকে নাযিল করেছেন। যেমনঃ
  • হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সহীফা অবতীর্ণ করা হয়েছে রমজানের এক তারিখে।
  • তাওরাত অবতীর্ণ করা হয়েছে রমজানের ৬ তারিখে, যাবুর অবতীর্ণ করা হয়েছে রমজানের ১২ তারিখে, ইঞ্জিল অবতীর্ণ করা হয়েছে রমজানের ১৮ তারিখে।
  • রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত শুধু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়, কেননা এই রমজান মাসেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে কারীম ও লাওহে মাহফুজে অবতীর্ণ করেছেন। তাছাড়া এই রমজানেই লাইলাতুল কদরের মতো ফজিলতপূর্ণ রাত ও আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন।
  • হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সওয়াবের আশায় ঈমানের সহিত রমজানের রোজা রাখল আল্লাহ তায়ালা তাঁর জীবনের সকল গুনাহ খাতা ক্ষমা করে দেন।(বুখারী শরীফ)
  • হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমজান এবং কোরআন কিয়ামতের ময়দানে বান্দা বান্দির মুক্তির জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট সুপারিশ করবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের উভয়ের সুপারিশকে কবুল করবেন।
  • অপর এক হাদিসের মধ্যে হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক বস্তুর যাকাত রয়েছে, তেমনি মানুষের শরীরের ও যাকাত রয়েছে। মানুষের শরীরের যাকাত হল রোজা।
  • অর্থাৎ সম্পদের যাকাত আদায় করলে যেভাবে সম্পদ পবিত্র হয়ে যায় তেমনি রোজার মাধ্যমে শরীরের যাকাত আদায় করলে শরীরও গুনাহ মুক্ত হয়ে যায়।
  • তাছাড়া কোরআন এবং হাদিসের মধ্যে অন্য সকল আমলের সওয়াবের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু রমজানের সওয়াবের পরিমাণ কত বেশি হবে সে ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ বান্দা রোজা রাখে কেবলমাত্র আমার সন্তুষ্টির জন্য লোক দেখাবার জন্য নয়। সুতরাং এর প্রতিদান স্বয়ং আমিই দেব।
  • আর যেই প্রতিদান আল্লাহ তা'আলা নিজে দিবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন তার পরিমাণ কত বেশি হবে তা আমাদের বুঝ শক্তির বাহিরে।

রোজা না রাখার শাস্তি

রোজার বিধান ও রোজার ফজিলত সম্পর্কে এই আলোচনায় এখন আমরা আলোচনা করব রোজা না রাখার শাস্তি। প্রতিটি মুসলমানের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। তাই বিশেষ ওজোর ছাড়া রোজা না রাখলে শাস্তি অবধারিত। আসুন বিস্তারিত ভাবে জেনে নেই রোজা না রাখার শাস্তি গুলো।
আবু উমামা বাহিলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনিয়াছি যে, একদা আমি স্বপ্নে দেখলাম যে দুইজন লোক এসে আমাকে দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে গেলেন, এবং বললেন আপনি উপরে উঠুন, তখন আমি বললাম আমার পক্ষে এত উপরে ওঠা সম্ভব নয়। তখন তারা দুজন বলল, আমরা আপনাকে সহযোগিতা করব, আমি তাদের আশ্বাস পেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম এবং পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেলাম।
সেখানে আমি প্রচন্ড চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কিসের আওয়াজ? তারা আমাকে বললঃ এটা ঐ সকল জাহান্নামীদের আওয়াজ যারা রোজা ভঙ্গ করেছে।
ইমাম জাহাবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেনঃ যে ব্যক্তি শরীয়ত অনুমোদিত কোনো কারণ ছাড়াই রমজানের রোজা ভঙ্গ করলো সে মদ্যপ ও জেনাকারীর চেয়েও নিকৃষ্ট।

রোজার নিয়ত আরবিতে

প্রতি এক বছর পর পর রোজা আসে। তাই অনেকেই আমরা রোজার নিয়ত আরবিতে করা ভুলে যায়। নিম্নে রোজার নিয়ত আরবিতে দেওয়া হল। আশা করি রোজার নিয়ত আরবিতে দেখলেই আপনার মুখস্থ হয়ে যাবে।
نويت ان اصوم غدا من شهر رمضان المبارك فرضا لك ياالله فتقبل منى انك انت السميع العليم
উচ্চারণঃ নাওয়াইতু আনাসুমা গদান মিন সাহারি রামাদানাল মোবারকি ফারদান লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতা কাবাল মিন্নি ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম।

রোজার নিয়ত বাংলায়

আমরা যারা রোজার নিয়ত আরবীতে জানিনা তাদের জন্য রোজার নিয়ত বাংলায় নিচে দেওয়া হল।
হে আল্লাহ আমি আগামীকাল রমজানের ফরজ রোজা আদায় করার নিয়ত করিলাম, আপনি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করুন। আপনি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।

রোজা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় মাসআলা

রোজা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় মাসআলা জানা আমাদের জন্য জরুরী। আল্লাহ তা'আলা তাঁর ইবাদতের জন্য মানুষকে তৈরি করেছেন। সেই সাথে প্রতিটি ইবাদতকে অনেক সহজ করে দিয়েছেন। তাই রোজা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় মাসআলা জানার মাধ্যমে আমরা সহজেই রোজা রাখার ক্ষেত্রে অনেক উপকৃত হব। তাই আসুন মনোযোগ সহকারে পড়ে জেনে নেই রোজা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় মাসআলা।
  1. ইনজেকশন নেওয়াঃ রোজা অবস্থায় ইনজেকশন নিলে রোজা ভঙ্গ হয় না।
  2. রক্ত দেওয়া ও নেওয়ার বিধানঃ রোজা অবস্থায় শরীর থেকে রক্ত বের করলে বা প্রবেশ করালে রোজা ভঙ্গ হয় না।
  3. স্যালাইন নেওয়াঃ স্যালাইন নেওয়া হয় সাধারণত রগে, আর রগ যেহেতু রোজা ভঙ্গ হওয়ার নির্ভরযোগ্য কোন মাধ্যম নয় তাই স্যালাইন নেওয়ার দাড়াও রোজা ভঙ্গ হবে না।
  4. ঢুস নেওয়াঃ ঢুস নেয়ার দ্বারা রোজা ভেঙ্গে যাবে। কেননা ঢুস প্রবেশ করানো হয় মলদ্বার দিয়ে। যা রোজা ভঙ্গ হওয়ার মাধ্যম।
  5. ইনসুলিনঃ ইনসুলিন গ্রহণ করার দ্বারা রোজা ভঙ্গ হয় না, কেননা ইনসুলিন প্রবেশ করানো হয় এমন জায়গায় যা রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য কোন রাস্তা নয়।
  6. দাঁত তোলাঃ বিশেষ প্রয়োজন না হলে রোজা অবস্থায় দাঁত তোলা মাকরুহ, রক্ত যদি থুতুর সমান বা তার চেয়ে বেশি হয়ে গলায় চলে যায় তাহলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
  7. টুথপেস্টঃ রোজা অবস্থায় টুথপেস্ট ব্যবহার করা মাকরুহ। কিন্তু যদি তা গলায় চলে যায় তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে।
  8. নকল দাঁতঃ রোজা অবস্থায় নকল দাঁত মুখে রাখলে রোজার কোন ক্ষতি হয় না অর্থাৎ প্রয়োজনে নকল দাঁত রোজা অবস্থায়ও ব্যবহার করা যেতে পারে এতে কোন অসুবিধা নেই।
  9. মুখে পান রেখে ঘুমিয়ে যাওয়াঃ রমজান মাসে আমরা অনেকেই সেহরি খাওয়ার পর মুখে পান নিয়ে শুয়ে শুয়ে তাসবিহ, জিকির আজকার করতে থাকি, এমতাবস্থায় অনেকেই ঘুমিয়ে যায়, এবং ফজরের আযান হওয়ার সময় ঘুম ভাঙ্গে, তাহলে এমন ব্যক্তির রোজা ফুকাহায়ে কেরামের মত অনুযায়ী ভেঙ্গে যাবে এবং উক্ত রোজা ক্বাজা করতে হবে তবে কাফফারা দিতে হবে না।
  10. ধুমপান করাঃ রোজা অবস্থায় ধূমপান করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং সে ক্ষেত্রে রোজার কাজা এবং কাফফারা উভয়টি আদায় করতে হবে।

শেষ কথা

উপরের আর্টিকেলে রমজান সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কিছু প্রশ্নোত্তর যেমন রোজা কাকে বলে, রোজার বিধান রোজার ফজিলত ও ইত্যাদি সম্পর্কে লেখা হয়েছে। 
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে লেখাটি পড়ে তার ওপর আমল করার তৌফিক দান করুন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

সার্চিং লিংক প্রোর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ১

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ২

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৩

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৪