শবে বরাত কাকে বলে ও শবে বরাতের আমল ও ফজিলত

প্রিয় পাঠক! আসসালামু আলাইকুম। আজকে আমরা শবে বরাতের আমল ও ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা করব। একজন মুসলমান হিসেবে শবেবরাতের আমল ও ফজিলত সম্পর্কে জানা খুবই জরুরী। কেননা আমরা যখন শবে বরাতের আমল ও ফজিলত সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাবো তখন আমাদের জন্য উক্ত রাতে আমল করা অত্যন্ত সহজ হয়ে যাবে।
শবে বরাত কাকে বলে
আলহামদুলিল্লাহ দীর্ঘ একটি বছর অপেক্ষা করার পর আমরা আমাদের জীবনে আরেকটি শবে বরাত পেতে যাচ্ছি ইনশাআল্লাহ। একজন মুসলমানের তার জীবনে শবেবরাত পাওয়াটা পরম সৌভাগ্যের। কেননা উক্ত রাত্রটি মুসলমানদের জন্য অল্প আমলে অত্যাধিক সোয়াব অর্জনের জন্য নির্ধারিত। তাই নিম্নে শবে বরাতের আমল, ফজিলত ও কতিপয় মাসআলা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

শবে বরাত কাকে বলে?

‘শবে বরাত’ এটি মূলত একটি ফার্সি শব্দ যার অর্থ হলো ভাগ্যের রাত। ইসলাম ধর্মে একথা বিশ্বাস করা হয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দার ভাগ্যে আগামী এক বছরে যা যা ঘটবে তা তিনি এক রাত্রিতেই নির্ধারণ করে থাকেন, আর যেই রাত্রিতে নির্ধারণ করেন সেই রাত্রিকে শবে বরাত বলা হয়।

শবে বরাতের আমল ও ফজিলত

শবে বরাত এমন একটি রাত যে রাত্রিতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক পরিমাণে আমল করতেন এবং উক্ত রাত্রিতে আমল করবার জন্য তিনি তার উম্মতদেরকেও উদ্বুদ্ধ করে গিয়েছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছু আমল দ্বারা বিশেষ কিছু এবাদত প্রমাণিত হয় যা তিনি এ রাতে করেছেন, সে আলোকে এ রাতের কিছু আমল নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১. নফল নামাজ পড়াঃ 
এই রাত্রিতে লম্বা কেরাতের মাধ্যমে নফল নামাজ আদায় করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্ধ শা‘বানের এই রাত্রিতে অধিক পরিমাণে নফল নামাজ আদায় করতেন। হাদিসে এসেছে:
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা বলেন: এক রাত্রিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে উঠে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং সেই নামাজে তিনি এত দীর্ঘ সময় সেজদা করলেন যে, আমার মনে সন্দেহ হচ্ছিল তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়া ত্যাগ করলেন কিনা।
তাই আমি উঠে গিয়ে তার হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি মারা দিলাম। আর আঙ্গুলটি নড়ে উঠলো তাতে আমি বুঝে নিলাম তিনি জীবিত আছেন। রাসুল সাঃ এর নামাজ শেষ হলে তিনি আমাকে বললেন:হে আয়শা! তুমি কি ভেবেছ যে আল্লাহর নবী তোমার উপর কোন অবিচার করেছে?
তখন আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কখনোই এমনটি ভাবিনি বরং আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে আল্লাহ তাআলা আপনাকে নিজের কাছে নিয়ে গেলেন কিনা। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন: তুমি কি জানো এই রাত্রি কোন রাত?
আমি বললাম তা আল্লাহ এবং তার রাসুল ভালো জানেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন এটি শাবানের পঞ্চদশ রজনী। এ রাত্রিতে আল্লাহতালা তার বান্দাদের প্রতি বিশেষ নজর দেন, ক্ষমা প্রার্থীদেরকে ক্ষমা করে দেন ।অভাবীদের অভাব দূর করে দেন।
২. দোয়া করাঃ
শবে বরাতের এই রাত্রিতে আল্লাহতালা তার দোয়া কবুল করে থাকেন, তাই এ রাত্রিতে আমাদের উচিত বেশি বেশি দোয়া করা। হাদীসে এসেছে:
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, পাঁচটি রাত এমন রয়েছে যেই রাত্রিগুলোতে বান্দার কোন দোয়া আল্লাহ তায়ালা ফেরত দেন না তার মধ্যে একটি হল শবেবরাত তথা শাবান মাসের ১৫ তম রজনী।
৩. বেশি বেশি তওবা ও ইস্তেগফার করাঃ
একজন বান্দার গুনাহ মাফের ক্ষেত্রে তওবার বিকল্প নেই। বান্দা যদি নিজের কৃত গুনাহের উপর লজ্জিত হয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং উক্ত গুনাহ ভবিষ্যতে আর না করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় তাহলে আল্লাহ তা'আলা তার তওবা কবুল করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। হাদিসের মধ্যে এসেছে,
হযরত ওসমান ইবনে আবিল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শাবান মাসের পঞ্চদশ রজনীতে আল্লাহ তাআলা এই বলে বান্দাদেরকে ডাকতে থাকেন যে, তোমাদের মধ্যে এমনকি কেউ আছে যে আমার কাছে ক্ষমা চায়? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। এমনকি কেউ আছে? যে অভাবী? আমি তার অভাব দূর করে দেব।
৪. বেশি বেশি তাসবিহ তাহলিল পাঠ করাঃ
৫. পরের দিন রোজা রাখাঃ
হাদিসে এসেছে,
হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, যখন তোমাদের সামনে সাবানের ১৫ তম রজনী এসে যায় তখন তোমরা সে রাতে বেশি বেশি ইবাদত বন্দেগী করো এবং পরবর্তী দিন রোজা রাখো।

শবেবরাত কি কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত?

শবে বরাতের ব্যাপারে কুরআনে কারীমের মধ্যে কোন আয়াত বর্ণিত নেই, যদিও অনেক ওলামায়ে কেরাম কিছু কিছু আয়াতের মাধ্যমে শবে বরাত সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে দলিল দিয়ে থাকেন, তা আসলে দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় যা বিভিন্ন মুফাসসিরীনে কেরামের কিতাবাদী অধ্যায়নের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি।
আর যে সকল হাদিসের মধ্যে শবে বরাতের কথা বলা হয়েছে সেগুলোও যয়ীফ তথা দুর্বল হাদিস। শুধুমাত্র একটি হাদিস পাওয়া যায় যেটা দুর্বল হাদিস নয় এবং জাল হাদিসও নয় তবে সেটা হাসান তথা উত্তম পর্যায়ের হাদিস।
এখন প্রশ্ন হতে পারে তাহলে কি শবেবরাতে আমল করা আমরা ছেড়ে দিব? এর উত্তরে ফুকাহায়েকেরাম বলেন, শবে বরাত একটি বরকতময় রাত্রি এই রাত্রিতে আমরা যেকোনো ধরনের আমল অবশ্যই করতে পারি। যদিও শবে বরাত সম্পর্কিত হাদিসগুলো সহিহ হাদিস নয়।
কিন্তু কোন বিষয়ে আমল গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সহীহ হাদিস থাকাটা জরুরী নয় বরং হাসান পর্যায়ের হাদিস ও যয়ীফ হাদিসও আমলের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য তাই আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি শবে বরাতে আমল করাতে কোন অসুবিধা নেই।
তবে এই রাত্রিকে অনেকে ভাগ্য নির্ধারক রাত্রি বলে থাকে যা নিতান্তই ভুল। কেননা ভাগ্য নির্ধারক রাত্রি হল লাইলাতুল কদর অর্থাৎ শবে কদর। শবে কদরে বান্দার জন্য ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে তাই শবে বরাত কে ভাগ্য নির্ধারক রাত্রি বলা সমীচীন নয়।

শবেবরাত কত তারিখে?

১৫ই শাবান ১৪৪৫ হিজরি।
১২ই ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ ।
২৫ শে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ইংরেজি রোজ রবিবার শবে বরাত অনুষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।

শবে বরাতে হালুয়া রুটি খাওয়ার বিধান

আমাদের সমাজে একটি রেওয়াজ বা একটি প্রথা চালু আছে আর তা হলো শবে বরাতকে কেন্দ্র করে ঘরে ঘরে হালুয়া রুটির আয়োজন করা, তা মসজিদে বিলানো, কবরস্থানে আগত মুসল্লিদেরকে দেওয়া, ঘরবাড়ি, মসজিদ রাস্তাঘাট ইত্যাদি আলোকসজ্জা করা।
এগুলো করা সম্পূর্ণ বিদআত। কেননা শবে বরাত শুধুমাত্র আমল করার জন্য কিন্তু এটাকে কেন্দ্র করে উল্লিখিত কাজকর্ম না সাহাবায়ে কেরাম করেছেন না তাদের পরবর্তী যুগের কোন মনীষী করেছেন। তাই আমাদের উচিত এ জাতীয় কর্ম থেকে বিরত থাকা।
তাছাড়া বেদআত তো বলা হয় ওই সকল কাজকে যেটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি, সাহাবায়ে কেরাম ও করেননি কিন্তু পরবর্তীতে সেটাকে সোয়াবের কাজে মনে করে আমল করতে থাকা।

শবেবরাতে কি রোজা রাখতে হয়?

শবে বরাতের ব্যাপারে যে সকল হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার মধ্যে বলা হয়েছে তোমরা সাবান মাসের ১৫ তারিখ রাত্রিতে ইবাদত বন্দেগী করো এবং দিনে রোজা রাখ সেই হিসেবে শবে বরাত কে কেন্দ্র করে আমরা রোজা রাখতে পারি তবে সেই রোজা রাখাটা আমাদের জন্য ওয়াজিব বা ফরজ কোন আমল নয়।
আর রোজাটি রাখতে হবে ১৫ তারিখ রাত্রি তথা শবে বরাত শেষ হবার পরে যেই দিনটি আসবে সেদিন অর্থাৎ ইংরেজি ২৬ তারিখে।

শেষ কথা

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে আগত শবে বরাত আমলের মাধ্যমে অতিবাহিত করার তৌফিক দান করুন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

সার্চিং লিংক প্রোর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ১

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ২

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৩

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৪