আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড ধান চাষ সম্পর্কে জানুন

কৃষি প্রধান এই দেশে আধুনিক উন্নত পদ্ধতিতে ধান চাষের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের কৃষিতে এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে আর তাই আমাদের আজকের আলোচনায় আমরা নিয়ে এসেছি আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড ধান চাষ সম্পর্কে জানুন। আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড ধান চাষ সম্পর্কে জানুন এই আলোচনাটি আপনি যদি সম্পূর্ণটুকু মনোযোগ সহকারে পড়েন তাহলে অবশ্যই হাইব্রিড ধান চাষ করে অনেক ভালো ফলন পাবেন।
আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড ধান চাষ সম্পর্কে জানুন

প্রতিটা দেশেরই অর্থনীতিতে বড় একটা ভূমিকা রাখে কৃষি। একমাত্র কৃষি হল টেকসই উন্নত পদ্ধতি। একটি দেশ যখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারে তখন সেই দেশের মাথাপিছু আয় অনেক বেড়ে যায়। আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড ধান চাষ করতে গেলে কয়েকটি বিষয়ের উপর বেশি নজর দিতে হবে তার মধ্যে একটি হল উন্নত মানের বীজ ব্যবহার।

সঠিক বীজ নির্বাচন

আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড ধান চাষ সম্পর্কে জানুন এই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সঠিক বীজ নির্বাচন। বীজ নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনি যদি ভুল করে ফেলেন তাহলে আপনার পুরো ফসলটি রিক্সের মধ্যে পড়ে যাবে। এখানে আমরা কিছু উন্নত জাতের হাইব্রিড ধানের বীজের কথা বলব। আপনি আপনার নিকটস্থ বীজের দোকান থেকে বীজগুলো ক্রয় করে নিতে পারেন। 
মনে রাখবেন শুধুমাত্র ভালো কোম্পানির বা ভালো বিষ কিনলেই হবে না আপনাকে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে হলে অবশ্যই সঠিক সময়ে সঠিক পরিচর্যা করতে হবে। কৃষি কাজ যেহেতু একটা বিজনেস এবং অনেকটাই প্রকৃতির উপরে নির্ভরশীল তাই মনে রাখতে হবে বিজনেস মানেই লাভ এবং লোকসান হতে পারে। তবে আপনি যদি সঠিক পরিকল্পনা করে কাজ করেন তাহলে অবশ্যই লাভ হওয়ার সম্ভাবনাটা বেশি।

বোরো মৌসুমে চাষকৃত হাইব্রিড ধানের জাত সমূহ

আলোচনার উপরের অংশে আমরা সঠিক বীজ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছি কিন্তু সঠিক বীজ বা ভালো বীজ কোনটি সেটি আমরা বলিনি। বোরো মৌসুমে চাষকৃত হাইব্রিড ধানের জাতসমূহ এই আলোচনায় এখন আমরা আপনাদের পরামর্শ দেবো ভালো মানের, ভালো কোম্পানির উচ্চ ফলনশীল জাতের নাম সমূহ। আসুন নিচের অংশটি মনোযোগ সহকারে পড়ে বড় মৌসুমে চাষকৃত হাইব্রিড ধানের জাত সমূহ জেনে নেই।
  • এসিআই৬- এসিআই সিড (চিকন জাত)
  • এসিআই ১- এসি আই সিড (মোটা জাত)
  • হীরা ১ এবং হীরা ২- সুপ্রিম সিড কোম্পানি (মোটা জাত)
  • জনক রাজ-ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার লিমিটেড (মোটা জাত)
  • সেনজেনটা ১২০৫-সেনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড (মোটা জাত)
  • তেজ গোল্ড -বায়ার ক্রপ সাইন্স লিমিটেড (চিকন জাত)
প্রিয় পাঠক, আমরা এখানে বেশ কয়েকটি ভালো মানের হাইব্রিড ধানের জাতের নাম উল্লেখ করেছি। এই নাম গুলো ছাড়াও বাজারে আরও অনেক ভালো কোম্পানির হাইব্রিড ধানের জাত পাওয়া যায়। আপনি আপনার নিকটস্থ বিশ্বস্ত বিজ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ভালো মানের, ভালো কোম্পানির একটি বিষ ক্রয় করবেন।

আমন মৌসুমে চাষকৃত হাইব্রিড ধানের জাত সমূহ

আমরা এখন আলোচনা করব আমল মৌসুমে চাকরি তো হাইব্রিড ধানের জাত সমূহ নিয়ে। যে সকল এলাকায় আমন মৌসুমে ধানের চাষ হয় এবং উফশি জাত বা দেশে জাত ব্যবহার করেন সে সকল কৃষকগণ উকশীদানের পরিবর্তে হাইব্রিড ধান ব্যবহার করবেন। কারণ আমন মৌসুমে ধান চাষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পাতা ঝলসানো রোগ বা ব্লাস্ট রোগ। বাজারে এখন পাতা ঝলসানো বা ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধি আমন মৌসুমের চাষ করার জন্য ধানের জাত পাওয়া যায় আসুন সেগুলো জেনে নিন।
  • ধানি গোল্ড - মার্কেটেড বাই এ সি আই সিড (চিকন জাত)
  • এ জেড ৭০০৬- মার্কেটেড বাই সুপ্রিম সীড কোম্পানি (চিকন জাত)
  • ১৬০১৯- বায়ার গ্রুপ সাইন্স লিমিটেড (চিকন জাত)
উপরে উল্লেখিত তিনটি জাতের মধ্যে যেকোনো একটি জাত চাষ করতে পারেন।

সঠিক নিয়মে বীজ গজানোর পদ্ধতি

আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড ধান চাষ সম্পর্কে জানুন এই আর্টিকেলে এখন আমরা আলোচনা করব সঠিক নিয়মে বীজ গজানোর পদ্ধতি সম্পর্কে। আমরা সব সময়ই সেকেলে বা পুরাতন পদ্ধতিতে ধানের বীজ জাক দিয়ে থাকি। 
ফলে ১০০ টি বীজের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ টি বজায় আর বাকিগুলো পচে বা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু আপনি যদি আধুনিক পদ্ধতিতে ধানের বীজ জারমিনেশান দেন তাহলে অবশ্যই 90 থেকে 95% বীজ গজাবে। তাই আসুন সঠিক নিয়মে গজানোর পদ্ধতি জেনে নিন।
  • প্রথমে প্যাকেট থেকে বীজ বের করে এক থেকে দুই ঘন্টা চটের ছালার উপর বীজগুলো বিছিয়ে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে।
  • তারপর বীজগুলো ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে ঠান্ডা করতে হবে।
  • এরপর একটি বালতিতে বা বড় গামলায় পরিষ্কার টিবয়েলের পানি নিয়ে বীজগুলো ধুয়ে নিতে হবে।
  • নতুন করে আবার বালতিতে পানি নিয়ে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে এর মাঝে একবার পানি পাল্টিয়ে দিতে হবে।
  • তারপর বীজগুলো বালতি থেকে উঠিয়ে একটি পরিষ্কার কাপড়ের রেখে পানি ঝরায় নিতে হবে।
  • এবার কলা পাতা বা চটের ছালার উপর চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি পুরো করে বীজগুলো ছড়ায় দিয়ে তার উপরে ভেজা চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
  • এবং তার উপরে আরো কিছু বস্তা এবং খড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে যাতে করে চটের ভিতরে হালকা গরম অনুভব তৈরি করা যায়।
  • এভাবে ৩৬ ঘন্টা জাগ দিয়ে রাখতে হবে তবে প্রয়োজন ভেদে পানির প্রয়োজন হলে চটের ছালার উপরে ঝাজড়ি দিয়ে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে।
  • এরপর ৮০% পার্সেন্ট বীজ অঙ্কুরিত হলে সম্পূর্ণ বীজ বের করে বিজ তলায় ছিটিয়ে দিতে হবে।

বীজহার ও বীজতলা তৈরি

বিজহার ও বীজতলা তৈরি আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বীজহার অর্থ হল জমিতে কি পরিমান বীজের প্রয়োজন হবে। আসুন আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়ে আরো ক্লিয়ার হই।
  • প্রতি একর বা ৩ বিঘা জমির জন্য 6 কেজি বীজের প্রয়োজন হবে।
  • বীজতলা রৌদ্রজ্জ্বল ও সেচ সুবিধা যুক্ত স্থানে হতে হবে।
  • প্রতি এক শতাংশ বীজতলায় ৭ থেকে ১০ মন পচা গোবর সাত দিতে হবে।
  • এবং সেই সাথে ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১ কেজি টিএসপি, ৬০০ গ্রাম এমও পি এবং 200 গ্রাম সালফেট বীজতলা তৈরির সময় দিতে হবে।
  • চারা উঠানোর এক সপ্তাহ আগে ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া সার বীজতলায় ছিটিয়ে দিতে হবে।
  • বীজ তলায় সেচ দিতে হবে, আগাছা মুক্ত রাখতে হবে এবং পোকামাকড় দমনের ব্যবস্থা করতে হবে।

সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি

নিম্নে একরপতি বা তিন বিঘা জমিতে সারের পরিমাণ উল্লেখ করা হলো।
  • পচা গোবর সার - ৫,০০০-৭,০০০ কেজি
  • ইউরিয়া - ১১০- ১২৫ কেজি
  • টিএসপি - ৫৫-৬০ কেজি
  • এমপি - ৫০-৬০ কেজি
  • জিপসাম - ২৫-২৮ কেজি
  • দস্তা - ৫-৬ কেজি
  • বোরন সার - ৪-৫ কেজি
সমস্ত ইউরিয়া সার এবং চার ভাগের এক ভাগ এমপি সার ব্যতীত অন্য সকল সার জমির তৈরীর শেষ চাষের সময় মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার সমান তিন ভাগে ভাগ করে প্রথম কিস্তি তিন ভাগের এক ভাগ চারা রোপনের ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে, দ্বিতীয় কিস্তি তিন ভাগের আরেক ভাগ চারা রোপনের ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে (সর্বোচ্চ খুশী অবস্থায়) এবং বাকি তিনভাগের এক ভাগ ইউরিয়া সার তার সাথে অবশিষ্ট এমওপি সার মিশিয়ে চারা রোপনের ৪৫ থেকে ৪৮ দিনের মধ্যে অর্থাৎ কাইজ থোর আসা অবস্থায় প্রয়োগ করতে হবে।

চারারোপণ পদ্ধতি

৮ ইঞ্চি পর পর সারি করে প্রতি সারিতে ছয় ইঞ্চি পর পর একটি করে সুস্থ সবল চারা লাগাতে হবে। অবশ্যই চারার বয়স ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে হতে হবে প্রতি গোছাতে মাত্র একটি সুস্থ সবল চারা রোপণ করতে হবে। চারার বয়স যদি ২৫ দিনের বেশি হয় তাহলে প্রতিদিনের সাথে তাল মিলিয়ে ১মন হারে ফলন কমতে থাকবে। তাই অবশ্যই সর্বোচ্চ ২৫ দিনের মধ্যেই হাইব্রিড ধানের চারা মূল জমিতে রোপণ করতে হবে।

সেচ প্রয়োগ

চারা রোপনের সময় জমিতে ১ থেকে ২ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে এবং জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে।পরবর্তীতে এমনভাবে সেচ দিতে হবে যাতে জমিতে সর্বক্ষণ রসের ব্যবস্থা থাকে। সার প্রয়োগের সময় জমি থেকে অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হবে।

রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন ব্যবস্থাপনা

ধানের জমিতে যে সকল পোকামাকড় আক্রমণ করে তার সম্ভাব্য তালিকা এবং দমন ব্যবস্থা নিচে প্রকাশ করা হলো।
ধানের জমিতে যে সকল রোগবালাইয়ের আক্রমণ হয় তার তালিকা এবং দমন ব্যবস্থাপনা নিচে বর্ণনা করা হলো।

ফসল সংগ্রহ

ফুল আসার ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর শতকরা ৮০ভাগ ধান পেকে গেলে অর্থাৎ ধান সোনালী বর্ণ ধারণ করলে ফসল সংগ্রহ করতে হবে।

উপসংহার

প্রিয় হাইব্রিড ধান চাষী ভাইয়েরা, আমরা চেষ্টা করেছি আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড ধান সম্পর্কে জানুন এই আর্টিকেলে হাইব্রিড ধানের আধুনিক চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে। আমাদের বিশ্বাস আপনারা যদি আর্টিকেলটি সম্পন্ন করে থাকেন তাহলে অবশ্যই আপনার হাইব্রিড ধান চাষাবাদের ক্ষেত্রে অনেক সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। 
তবে একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে কৃষি একটি প্রকৃতি নির্ভর বিজনেস। এখানে প্রকৃতির যেকোনো পরিবর্তনের সাথে কৃষির ও পরিবর্তন হয়। তাই সময়ের সাথে সাথে আপনার সিদ্ধান্তেরও কিছু পরিবর্তন বা আমাদের আলোচনারও কিছু পরিবর্তন হতে পারে চাষাবাদের ক্ষেত্রে। এছাড়াও কৃষির যেকোনো পরামর্শের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন আমরা চেষ্টা করব সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

সার্চিং লিংক প্রোর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ১

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ২

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৩

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৪